একটি নবজাতকের জন্মের মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে আমরা সফলভাবে গ্যাস্ট্রোস্কিসিসের (Gastroschisis) জরুরি অপারেশন সম্পন্ন হয়েছে। শিশু সার্জন ডা: মো: সামিউল হাসান এর নেতৃত্বে অভিজ্ঞ সার্জারি ও এনেস্থিসিয়া টিম এলায়েন্স হাসপাতাল লিমিটেড, শ্যামলী, ঢাকা তে এই জটিল অপারেশন সম্পন্ন করেন। জীবনের একেবারে শুরুতে, যখন শিশুটি পৃথিবীর আলো দেখার পর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পার করেছে, তখনই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, নিরাপদ অ্যানেস্থেশিয়া এবং সমন্বিত নবজাতক সার্জারি সেবার মাধ্যমে অপারেশনটি করা হয়।

দ্রুত সময়ের মধ্যে অপারেশন এই শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করেছে
এই সফল চিকিৎসা আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তুলে ধরে—নবজাতক খুব ছোট বলে প্রয়োজনীয় অপারেশন পিছিয়ে দেওয়া উচিত নয়। জন্মের পর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বয়সেও শিশুর জীবন রক্ষার জন্য জরুরি অপারেশন প্রয়োজন হতে পারে। শিশুর বয়সের চেয়ে তার রোগের ধরন, শারীরিক অবস্থা এবং অপারেশনের প্রয়োজনীয়তাই চিকিৎসার সিদ্ধান্তে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
গ্যাস্ট্রোস্কিসিস কী?
Gastroschisis হলো শিশুর পেটের দেয়ালের একটি জন্মগত ত্রুটি। সাধারণত নাভির ডান পাশে একটি ছিদ্র থাকে, যার মধ্য দিয়ে খাদ্যনালী শরীরের বাইরে বেরিয়ে আসে।
এই খাদ্যনালীর ওপর কোনো প্রতিরক্ষামূলক আবরণ থাকে না। গর্ভাবস্থায় খাদ্যনালী সরাসরি গর্ভের পানির সংস্পর্শে থাকার কারণে সেটি ফুলে যেতে, মোটা হয়ে যেতে বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জন্মের পর বাইরের পরিবেশে উন্মুক্ত থাকায় শরীর থেকে দ্রুত তাপ ও তরল হারানো, জীবাণু সংক্রমণ এবং খাদ্যনালীর রক্তপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়।
তাই গ্যাস্ট্রোস্কিসিস সাধারণ কোনো জন্মগত ত্রুটি নয়; এটি একটি সময়-সংবেদনশীল নবজাতক সার্জিক্যাল জরুরি অবস্থা।
জন্মের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
গ্যাস্ট্রোস্কিসিস নিয়ে জন্মানো শিশুর চিকিৎসা অপারেশন থিয়েটারে শুরু হয় না। জন্মের মুহূর্ত থেকেই সঠিক ব্যবস্থাপনা শুরু করতে হয়।
প্রাথমিকভাবে শিশুর—
- শরীরের বাইরে থাকা খাদ্যনালী জীবাণুমুক্ত ও আর্দ্র আবরণে সুরক্ষিত রাখা
- শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখা
- শ্বাসপ্রশ্বাস ও রক্তসঞ্চালন স্থিতিশীল করা
- শিরায় প্রয়োজনীয় তরল ও ওষুধ দেওয়া
- পাকস্থলীতে জমা তরল বের করার ব্যবস্থা করা
- ইনফেকশন প্রতিরোধে উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া
- দ্রুত শিশু সার্জারি ও নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা দলের কাছে স্থানান্তর করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাইরে থাকা খাদ্যনালী অযথা দীর্ঘ সময় উন্মুক্ত থাকলে তাপ ও পানি শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। খাদ্যনালীর ওপর চাপ, মোচড় বা রক্তপ্রবাহের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ কারণে শিশুকে স্থিতিশীল করার পর যত দ্রুত সম্ভব সার্জিক্যাল পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
জন্মের তিন ঘণ্টার মধ্যে অপারেশন—কেন এটি তাৎপর্যপূর্ণ?
নবজাতকের অপারেশান অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও চ্যালেঞ্জিং। জন্মের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টায় শিশুর শরীরকে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। এ সময় শরীরের তাপমাত্রা, রক্তে শর্করা, তরল ও লবণের ভারসাম্য, শ্বাসপ্রশ্বাস এবং রক্তচাপ দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। এই অবস্থায় গ্যাস্ট্রোস্কিসিসের মতো জটিল রোগের অপারেশন করতে প্রয়োজন—
- দক্ষ নবজাতক ও শিশু সার্জারি দল
- অভিজ্ঞ শিশু অ্যানেস্থেশিয়া সেবা
- উন্নত অপারেশন থিয়েটার
- নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট
- যথাযথ তাপমাত্রা ও তরল ব্যবস্থাপনা
- অপারেশনের পর নিবিড় পর্যবেক্ষণ
- প্যারেন্টেরাল নিউট্রিশনসহ উন্নত পুষ্টি সহায়তা
শিশুটির জন্মের তিন ঘণ্টার মধ্যে অপারেশন সম্পন্ন হওয়া এই সমন্বিত চিকিৎসাব্যবস্থারই প্রতিফলন।
অপারেশনে কী করা হয়?
শিশুটির জন্মের ২ ঘন্টার মধ্যে ঢাকার শ্যামলী তে অবস্থিত এলায়েন্স হাসপাতাল লিমিটেড এর নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (NICU) শিশু সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মো: সামিউল হাসান এর তত্বাবধানে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের সকল চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য সকলের সহযোগিতায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাকে অপারেশনের জন্য প্রস্তুত করা হয় । আধুনিক অপারেশন থিয়েটার এ সম্পূর্ণ জীবানু মুক্ত পরিবেশে এবং বাচ্চার শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে দ্রুততম সময়ে র মধ্যে অপারেশন শেষ করা হয় ।অত্যন্ত দক্ষ শিশু এনেস্থেটিস্ট এই সময়ে বাচ্চা কে অজ্ঞান করা এবং অপারেশন এর পর বাচ্চাকে স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসেন । এরপর শিশুটিকে NICU তে পর্যবেক্ষণ এ রাখা হয়। সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পর তাকে হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়া হয়েছে ।
তবে সব শিশুর ক্ষেত্রে একইভাবে অপারেশন করা যায় না। যদি খাদ্যনালী খুব বেশি ফুলে না থাকে এবং পেটের ভেতরে পর্যাপ্ত জায়গা থাকে, তাহলে একবারেই খাদ্যনালী ভেতরে নিয়ে পেটের দেয়াল বন্ধ করা যেতে পারে। একে Primary Closure বলা হয়।
অন্যদিকে, খাদ্যনালী বেশি ফোলা থাকলে বা একবারে ভেতরে নেওয়ার কারণে পেটের ভেতরের চাপ বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে একটি বিশেষ Silo ব্যবহার করা হয়। কয়েক দিনের মধ্যে ধীরে ধীরে খাদ্যনালী পেটের ভেতরে নেওয়া হয় এবং পরে পেট বন্ধ করা হয়। একে Staged Closure বলা হয়।
সুতরাং দ্রুত চিকিৎসা মানে তাড়াহুড়া করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে পেট বন্ধ করা নয়। এর অর্থ হলো—দ্রুত মূল্যায়ন, দ্রুত স্থিতিশীলকরণ এবং শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতিটি সময়মতো নির্বাচন করা।
নবজাতকের অপারেশনের জন্য কি কোনো ন্যূনতম বয়স আছে?
অনেক অভিভাবক জানতে চান, “শিশু এত ছোট—এখনই কি অপারেশন করা সম্ভব?”
উত্তর হলো, প্রয়োজন হলে জন্মের প্রথম দিনেই, এমনকি জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেও অপারেশন করা সম্ভব। নবজাতকের প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের জন্য আলাদা কোনো ন্যূনতম বয়স নেই।
খাদ্যনালীর জন্মগত বন্ধ থাকা, অন্ত্রের বাধা, অন্ত্রের মোচড়, মলদ্বারের জন্মগত ত্রুটি, গ্যাস্ট্রোস্কিসিস বা অন্ত্রে ছিদ্র—এ ধরনের রোগে শিশুর বয়স বাড়ার জন্য অপেক্ষা করলে অবস্থা আরও জটিল হয়ে যেতে পারে।
তবে প্রতিটি শিশুকে অপারেশনের আগে যতটা সম্ভব স্থিতিশীল করা হয়। অর্থাৎ “দ্রুত অপারেশন” এবং “নিরাপদ প্রস্তুতি”—দুটিই একসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ।
দেরি হলে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে?
গ্যাস্ট্রোস্কিসিসের চিকিৎসায় অপ্রয়োজনীয় দেরি হলে—
- শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি ও তাপ হারাতে পারে
- অন্ত্র আরও ফুলে যেতে পারে
- অন্ত্রের রক্তপ্রবাহ কমে যেতে পারে
- সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে
- অন্ত্র পেটের ভেতরে ফিরিয়ে নেওয়া কঠিন হতে পারে
- শ্বাসপ্রশ্বাস ও রক্তসঞ্চালন জটিল হতে পারে
- হাসপাতালে থাকার সময় দীর্ঘ হতে পারে
তাই গর্ভাবস্থায় রোগটি শনাক্ত হলে পরিকল্পিতভাবে এমন হাসপাতালে প্রসব করানো উচিত, যেখানে নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা, শিশু অ্যানেস্থেশিয়া এবং শিশু সার্জারি সেবা রয়েছে।
শুধু অপারেশনই নয়—অপারেশনের পরের চিকিৎসাও সমান গুরুত্বপূর্ণ
গ্যাস্ট্রোস্কিসিসের সফল চিকিৎসা অপারেশন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্পন্ন হয়ে যায় না। অন্ত্র দীর্ঘ সময় গর্ভের পানির সংস্পর্শে থাকার কারণে অপারেশনের পর স্বাভাবিকভাবে কাজ শুরু করতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
এই সময় শিশুর প্রয়োজন হতে পারে—
- NICU-তে নিবিড় পর্যবেক্ষণ
- শিরার মাধ্যমে পুষ্টি
- পাকস্থলীর ডিকমপ্রেশন
- সংক্রমণ প্রতিরোধ
- তরল ও ইলেক্ট্রোলাইট নিয়ন্ত্রণ
- ধীরে ধীরে বুকের দুধ বা অন্যান্য খাবার শুরু করা
- শ্বাসপ্রশ্বাসের সহায়তা
- ক্ষত ও অন্ত্রের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ
অন্ত্র স্বাভাবিকভাবে কাজ শুরু করলে ধীরে ধীরে খাবার বাড়ানো হয়। এই চিকিৎসা কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। জটিল গ্যাস্ট্রোস্কিসিসে আরও দীর্ঘ চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
অভিভাবকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
গর্ভাবস্থার আল্ট্রাসনোগ্রামে গ্যাস্ট্রোস্কিসিস ধরা পড়লে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত একজন শিশু সার্জন, প্রসূতি বিশেষজ্ঞ ও নবজাতক বিশেষজ্ঞের সমন্বিত পরামর্শ নিন।
প্রসবের স্থান আগে থেকেই পরিকল্পনা করুন। শিশুকে এমন প্রতিষ্ঠানে জন্ম দেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ, যেখানে জন্মের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় রিসাসিটেশন, NICU ও শিশু সার্জারি সেবা দেওয়া সম্ভব।
অন্য হাসপাতালে জন্ম হলে শিশুর বাইরে থাকা অন্ত্রকে শুকিয়ে যেতে না দিয়ে সুরক্ষিতভাবে ঢেকে, শরীর গরম রেখে এবং দেরি না করে বিশেষায়িত কেন্দ্রে স্থানান্তর করতে হবে। অন্ত্রকে জোর করে পেটের ভেতরে ঢোকানোর চেষ্টা করা উচিত নয়।
আমাদের অঙ্গীকার
জন্মের মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে এই শিশুর সফল গ্যাস্ট্রোস্কিসিস অপারেশন আমাদের দলের জন্য আনন্দের পাশাপাশি একটি বড় দায়িত্বের প্রতীক।
আমাদের লক্ষ্য—
- জরুরি নবজাতক সার্জিক্যাল রোগ দ্রুত শনাক্ত করা
- প্রয়োজনীয় অপারেশনে অযথা বিলম্ব না করা
- শিশুর অবস্থা অনুযায়ী নিরাপদ ও প্রমাণভিত্তিক পদ্ধতি নির্বাচন করা
- দক্ষ সার্জারি, অ্যানেস্থেশিয়া ও NICU সেবার সমন্বয় নিশ্চিত করা
- অপারেশনের পর দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টি ও ফলো-আপ প্রদান করা
গ্যাস্ট্রোস্কিসিস একটি গুরুতর হলেও চিকিৎসাযোগ্য জন্মগত সমস্যা। সময়মতো রোগ নির্ণয়, জন্মের পর অন্ত্রের সঠিক সুরক্ষা, দ্রুত স্থিতিশীলকরণ এবং উপযুক্ত সময়ে অস্ত্রোপচার করলে ভালো ফলাফলের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
নবজাতক মাত্র কয়েক ঘণ্টার বলে তার প্রয়োজনীয় অপারেশন পিছিয়ে দেওয়া উচিত নয়। বরং এই ক্ষুদ্র ও কোমল শিশুদের জন্য প্রয়োজন আরও দ্রুত, আরও দক্ষ এবং আরও সমন্বিত চিকিৎসা।
জরুরি নবজাতক সার্জারিতে বয়স নয়—শিশুর প্রয়োজনই সিদ্ধান্তের প্রধান ভিত্তি। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসাই পারে একটি নবজাতকের জীবন ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে।
ডা: মো: সামিউল হাসান
সহযোগী অধ্যাপক (শিশু সার্জারি)
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইন্সটিটিউট
নবজাতক ও শিশু সার্জারি এবং শিশু ইউরোলজি বিশেষজ্ঞ

