শিশুদের জটিল হাইপোস্পেডিয়াস চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা
Proximal Hypospadias বা জটিল হাইপোস্পেডিয়াস ছেলেশিশুদের একটি জন্মগত সমস্যা, যেখানে প্রস্রাবের ছিদ্রটি লিঙ্গের অগ্রভাগে না থেকে নিচের দিকে অবস্থান করে। অপেক্ষাকৃত মৃদু হাইপোস্পেডিয়াসে ছিদ্রটি লিঙ্গের অগ্রভাগের কাছাকাছি থাকে। কিন্তু জটিল বা প্রক্সিমাল পেনাইল হাইপোস্পেডিয়াসে প্রস্রাবের ছিদ্র লিঙ্গের গোড়ার কাছাকাছি অবস্থান করে এবং অনেক শিশুর লিঙ্গ নিচের দিকে বাঁকা থাকে। এই বাঁকাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় কর্ডি বা chordee বলা হয়। প্রক্সিমাল হাইপোস্পেডিয়াসের অস্ত্রোপচার তুলনামূলকভাবে জটিল। কারণ এসব শিশুর লিঙ্গের আকার ছোট হতে পারে, প্রস্রাবের নালি তৈরির উপযোগী টিস্যু কম থাকতে পারে এবং কর্ডি বেশি হলে এক বা একাধিক ধাপে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। অপারেশনের সময় টিস্যুর মান, রক্তনালির পরিমাণ এবং লিঙ্গের আকার ভালো থাকলে সার্জনের জন্য পুনর্গঠন সহজ হতে পারে।
এই বাস্তব সমস্যার সমাধান খুঁজতেই বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে আমরা প্রক্সিমাল হাইপোস্পেডিয়াসে আক্রান্ত শিশুদের ওপর ইনট্রামাসকুলার টেস্টোস্টেরন হরমোন থেরাপির প্রভাব নিয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করি। গবেষণাটি Surgery on Children জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
কেন এই গবেষণা প্রয়োজন ছিল?
হাইপোস্পেডিয়াস অপারেশনের আগে টেস্টোস্টেরন ব্যবহারের প্রধান উদ্দেশ্য হলো সাময়িকভাবে লিঙ্গের দৈর্ঘ্য ও টিস্যুর পরিমাণ বৃদ্ধি করা। টেস্টোস্টেরন লিঙ্গের ত্বক, প্রিপিউশিয়াল টিস্যু এবং করপাস স্পঞ্জিওসামের বৃদ্ধি ও রক্তনালির বিকাশে সহায়তা করতে পারে। এতে অপারেশনের সময় নতুন প্রস্রাবের নালি তৈরি করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে। আগের বিভিন্ন গবেষণায় টেস্টোস্টেরন ব্যবহারের পর লিঙ্গের মোট দৈর্ঘ্য বৃদ্ধির কথা বলা হলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার ছিল না। যেমন—
- মিয়াটাস বা প্রস্রাবের ছিদ্রের পেছনের অংশ কতটা বৃদ্ধি পায়?
- লিঙ্গের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধির ফলে হাইপোস্পেডিয়াসের আপেক্ষিক তীব্রতা কমে কি না?
- টেস্টোস্টেরন দেওয়ার পর কর্ডি বা লিঙ্গের বাঁক কমে কি না?
- এই চিকিৎসায় কী ধরনের সাময়িক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে?
এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্যই বর্তমান গবেষণাটি করা হয়।
কীভাবে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে?
এটি ছিল একটি নন-র্যান্ডমাইজড ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের সার্জারি বহির্বিভাগে ২০২২ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত মোট ২২ মাস গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষণায় প্রক্সিমাল পেনাইল হাইপোস্পেডিয়াসে আক্রান্ত মোট ২০ জন শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের বয়স ছিল ১৬ থেকে ১০৮ মাস এবং গড় বয়স প্রায় ৪২ মাস। পূর্বে হাইপোস্পেডিয়াসের অপারেশন হয়েছে, আগে হরমোন চিকিৎসা নিয়েছে অথবা Disorders of Sex Development ছিল—এমন শিশুদের গবেষণা থেকে বাদ দেওয়া হয়। চিকিৎসা শুরুর আগে প্রত্যেক শিশুর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিমাপ করা হয়—
- লিঙ্গের মোট দৈর্ঘ্য
- প্রস্রাবের ছিদ্রের পেছনের অংশের দৈর্ঘ্য
- ছিদ্রের সামনের অংশের দৈর্ঘ্য
- মিয়াটাসের অবস্থান
- কর্ডির মাত্রা
শিশুদের শরীরের ওজন অনুযায়ী প্রতি কেজিতে ২ মিলিগ্রাম ইনট্রামাসকুলার টেস্টোস্টেরন দেওয়া হয়। ইনজেকশনের পর নির্দিষ্ট বিরতিতে আবার পরিমাপ করা হয়। কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখা গেলে চিকিৎসা বন্ধ করে অস্ত্রোপচারের জন্য পাঠানো হয়। টেস্টোস্টেরনের প্রভাব সাময়িক হওয়ায় গবেষণার শিশুদের ৬০ দিনের মধ্যে অপারেশন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রাখা হয়েছিল।
গবেষণায় কী ফলাফল পাওয়া গেছে?
গবেষণার ফলাফল ছিল উৎসাহব্যঞ্জক।
লিঙ্গের মোট দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পেয়েছেঃ টেস্টোস্টেরন দেওয়ার আগে শিশুদের লিঙ্গের গড় মোট দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২০.১০ মিলিমিটার। চিকিৎসার পর তা বেড়ে প্রায় ২৯.২০ মিলিমিটার হয়। অর্থাৎ গড়ে প্রায় ৯ মিলিমিটার বৃদ্ধি পাওয়া গেছে, যা পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।

মিয়াটাসের পেছনের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছেঃ প্রস্রাবের ছিদ্র থেকে লিঙ্গের গোড়া পর্যন্ত অংশের গড় দৈর্ঘ্য চিকিৎসার আগে ছিল প্রায় ৫.১৫ মিলিমিটার। টেস্টোস্টেরন থেরাপির পর এটি বেড়ে প্রায় ১২.১৫ মিলিমিটার হয়। এই অসম বা disproportionate বৃদ্ধির কারণে প্রস্রাবের ছিদ্রটি বাস্তবে স্থান পরিবর্তন না করলেও বড় হয়ে যাওয়া লিঙ্গের তুলনায় ছিদ্রটির অবস্থান অপেক্ষাকৃত সামনের দিকে মনে হয়েছে।
অর্ধেক শিশুর হাইপোস্পেডিয়াসের আপেক্ষিক অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছেঃ চিকিৎসার আগে ২০ জন শিশুর সবার মিয়াটাস প্রক্সিমাল অবস্থানে ছিল। টেস্টোস্টেরন থেরাপির পর ১০ জনের ক্ষেত্রে তা এখনও প্রক্সিমাল থাকলেও বাকি ১০ জনের ক্ষেত্রে মিয়াটাসকে মিড-পেনাইল অবস্থান হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা সম্ভব হয়েছে। এই পরিবর্তনও পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা প্রয়োজন—টেস্টোস্টেরন প্রস্রাবের ছিদ্রকে সরিয়ে দেয়নি। বরং ছিদ্রের পেছনের লিঙ্গের অংশ বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় হাইপোস্পেডিয়াসের আপেক্ষিক তীব্রতা কমেছে।
কর্ডির মাত্রা কমেছেঃ চিকিৎসার আগে শিশুদের কর্ডির গড় মাত্রা ছিল প্রায় ৫৫ ডিগ্রি। টেস্টোস্টেরন দেওয়ার পর তা কমে প্রায় ৪৩.২৫ ডিগ্রি হয়। অর্থাৎ গড়ে প্রায় ১২ ডিগ্রির মতো উন্নতি হয়েছে। তবে চিকিৎসার পরও অনেক শিশুর উল্লেখযোগ্য কর্ডি রয়ে গেছে। তাই টেস্টোস্টেরনকে কর্ডির চূড়ান্ত চিকিৎসা হিসেবে দেখা যাবে না; অস্ত্রোপচারের সময় প্রয়োজনীয় সংশোধন এখনও অপরিহার্য।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
গবেষণার ২০ জন শিশুর মধ্যে মাত্র একজনের সাময়িকভাবে পিউবিক হেয়ার বা যৌনাঙ্গের আশপাশে লোম দেখা যায়। অন্য শিশুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আক্রমণাত্মক আচরণ, যৌনাঙ্গের অতিরিক্ত রং পরিবর্তন বা অন্যান্য বড় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। এ ধরনের হরমোনজনিত পরিবর্তন সাধারণত সাময়িক এবং ওষুধ বন্ধ করার পর কমে যেতে পারে। তবে টেস্টোস্টেরন কোনো সাধারণ বৃদ্ধি-বর্ধক ওষুধ নয়। এটি কেবল নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে শিশু সার্জন বা শিশু ইউরোলজিস্টের নিবিড় তত্ত্বাবধানে ব্যবহার করা উচিত।
এই গবেষণা ভবিষ্যতে শিশুদের সেবায় কী পরিবর্তন আনতে পারে?
গবেষণার ফলাফল থেকে ধারণা পাওয়া যায় যে, নির্বাচিত প্রক্সিমাল হাইপোস্পেডিয়াস রোগীর ক্ষেত্রে অপারেশনের আগে সঠিক মাত্রায় ইনট্রামাসকুলার টেস্টোস্টেরন ব্যবহার করলে—
- লিঙ্গের দৈর্ঘ্য ও প্রয়োজনীয় টিস্যুর পরিমাণ বাড়তে পারে
- অপারেশনের জন্য টিস্যু নিয়ে কাজ করা সহজ হতে পারে
- মিয়াটাসের আপেক্ষিক অবস্থান কিছুটা উন্নত হতে পারে
- কর্ডির মাত্রা আংশিকভাবে কমতে পারে
- জটিল হাইপোস্পেডিয়াসের সার্জিক্যাল পরিকল্পনা আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক করা সম্ভব হতে পারে
ভবিষ্যতে আমরা প্রতিটি শিশুর লিঙ্গের আকার, মিয়াটাসের অবস্থান, কর্ডির মাত্রা ও সম্ভাব্য অস্ত্রোপচার পদ্ধতি মূল্যায়ন করে কারা প্রি-অপারেটিভ হরমোন থেরাপি থেকে সত্যিকারভাবে উপকৃত হবে, তা আরও নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করতে পারব।এতে একই চিকিৎসা সবার জন্য প্রয়োগ না করে রোগীভিত্তিক চিকিৎসা পরিকল্পনা করা সম্ভব হবে।
আরও গবেষণা কেন প্রয়োজন?
ফলাফল আশাব্যঞ্জক হলেও গবেষণাটির কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এতে মাত্র ২০ জন শিশু অংশ নিয়েছে এবং কোনো র্যান্ডমাইজড নিয়ন্ত্রণ দল ছিল না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, গবেষণাটি টেস্টোস্টেরন দেওয়ার পর লিঙ্গের পরিবর্তন মূল্যায়ন করেছে; কিন্তু অপারেশনের পর ফিস্টুলা, স্টেনোসিস, ক্ষত শুকানো, পুনরায় অপারেশন এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর ফলাফল মূল্যায়ন করেনি। গবেষণায় গ্ল্যান্সের প্রস্থ, ইউরেথ্রাল প্লেটের আকার, লিঙ্গের ব্যাস এবং রক্তে হরমোনের মাত্রাও পরীক্ষা করা হয়নি। লেখকেরা তাই বৃহৎ, বহুকেন্দ্রিক ও সুপরিকল্পিত গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
ভবিষ্যৎ গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত—
- বড় সংখ্যক রোগী অন্তর্ভুক্ত করা
- টেস্টোস্টেরন পাওয়া ও না-পাওয়া দলের তুলনা করা
- অপারেশনের সাফল্য ও জটিলতা মূল্যায়ন করা
- দীর্ঘমেয়াদি প্রস্রাবের কার্যকারিতা ও সৌন্দর্যগত ফলাফল দেখা
- বয়স ও হাইপোস্পেডিয়াসের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত ডোজ নির্ধারণ করা
- হরমোনের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা যাচাই করা
বাংলাদেশের শিশুদের জন্য নিরাপদ, বিজ্ঞানভিত্তিক ও উন্নত হাইপোস্পেডিয়াস চিকিৎসা নিশ্চিত করতে স্থানীয় গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশের তথ্য সবসময় আমাদের দেশের শিশুদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও চিকিৎসা-বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মিলবে—এমন নয়। এই গবেষণা আমাদের নিজস্ব রোগীদের তথ্য থেকে প্রমাণ তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ফলাফল চূড়ান্ত নির্দেশিকা নয়, তবে এটি ভবিষ্যতের বৃহত্তর গবেষণা এবং আরও উন্নত প্রি-অপারেটিভ পরিকল্পনার ভিত্তি তৈরি করেছে। সঠিক রোগী নির্বাচন, নিরাপদ হরমোন ব্যবহার, দক্ষ অস্ত্রোপচার এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপের সমন্বয়ের মাধ্যমে আমরা প্রক্সিমাল হাইপোস্পেডিয়াসে আক্রান্ত শিশুদের আরও কার্যকর, নিরাপদ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা দিতে পারব।
ডাঃ মোঃ সামিউল হাসান
সহযোগী অধ্যাপক (শিশু সার্জারি)
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইন্সটিটিউট
প্রকাশিত গবেষণা:
Mahmud R, Hasan S, Islam N, Mitul AR. Role of intramuscular testosterone therapy for the position of meatus as well as the changes in the degree of chordee on proximal penile hypospadias in children: a non-randomized clinical trial. Surgery on Children. 2025;2(1):5–10. https://journal-soc.com/Publication/DisplayArticle/27785

