আকসা! আমার জন্য এখনো একটা দীর্ঘশ্বাস। ছোট্ট মেয়েটা আমার ডিপার্টমেন্ট এ অন্য আর দশ টা বাচ্চা রোগীর মতোই ছিল। আউটডোর এ আমার কাছে যখন আসে তখন তার রোগ নির্নয় হয়ে গিয়েছিল। মাঝে মাঝেই পেটে ব্যাথা হত তার। কয়েকজন ডাক্তার দেখেছেন। আল্ট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষায় ধরা পড়েছিল কোলেডোকাল সিস্ট (Choledochal cyst)। এরপর এম আর সি পি পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয় টাইপ ১ কোলেডোকাল সিস্ট। অপারেশন করতে হবে, তার জন্যই আমাদের কাছে আসা।
কোলেডোকাল সিস্ট হল পিত্তনালীর সমস্যা। এই রোগে পিত্তনালী মোটা হয়ে যায়। লিভার থেকে পিত্ত তৈরি হয়ে পিত্তনালী দিয়ে খাদ্যনালী তে সম্পুর্ন ভাবে যেতে পারে না, পিত্তনালীতে জমে থাকে। আস্তে আস্তে পিত্তনালি মোটা হয়ে যায়। রোগীর মাঝে মাঝে পেটে র ডান পাশে ব্যাথা হয়, কখনো কখনো জন্ডিস হয়, কারো কারো আবার পিত্তনালী তে ইনফেকশন ও হয়। বাচ্চাদের এই রোগ বেশি হয়, তবে বড়দের ও হয়। সধারনত পিত্তনালী ও অগ্নাশয় এর নালীর সংযোগস্থলে জন্মগত কোন সমস্যা থাকলে কোলেডোকাল সিস্ট হওয়ার এর সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
কোলেডোকাল সিস্ট এর চিকিৎসা সবসময়ই সার্জিক্যাল। অপারেশন করে সিস্ট কেটে ফেলে পিত্তনালীর সাথে খাদ্যনালীর একটা বাইপাস করা হয়। আমরা যে অপারেশন টা করি তার নাম Excision of cyst and Roux-N-Y hepaticojejunostomy. এইটাই এই রোগের সর্বজন স্বীকৃত অপারেশন। অপারেশন টা একটু জটিল কিন্তু এই অপারেশনে আমাদের সাফল্যের হার ইর্ষনীয়।
আকসার বাবা মা কে তাই আমি বলেছিলাম- অপারেশন টা জটিল, ঝুকি আছে, কিন্তু অপারেশন এর বিকল্প কোন চিকিৎসা নাই। এই কথা আসলে আমি সব রোগীর অভিভাবক কেই বলি। কারন যে কোন অপারেশন এই যে কোন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কোন অপারেশন ই ছোট না, আমার সার্জারি ক্যারিয়ার এ আমি দেশে বিদেশে অনেক দুর্ঘটনা দেখেছি। ওর ক্ষেত্রেও তাই একই কথা বলেছিলাম, এর বেশি কিছু না। কারন, এর আগের দুই বছরে এই অপারেশন আমরা এতো করেছিলাম যে এইটা আমাদের কাছে একটা মুখস্ত অপারেশন এর মতো ছিল। সব রোগীকেই আমরা অপারেশন এর ৪র্থ/৫ম দিনে ছুটি দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেই। ওই দুই বছরে শুধু একটা বাচ্চার বাইপাস লিক করেছিল, যেটা পরে আবার অপারেশন এর দরকার পড়েছিল এবং দ্বিতীয় অপারেশন এর পর বাচ্চা সুস্থ হয়ে গিয়েছিল। জটিল এই অপারেশন এর এমন সাফল্যের কারনেই হয়তো আকসা আমাদের কাছে বিশেষ কোন রোগী ছিলনা। আর দশ টা রোগীর মতই নিয়মিত রোগী।
ভর্তির পর যথারীতি আকসা র অপারেশন করি। অপারেশন টা একটু বেশি জটিল ছিল, কারন ওর সিস্ট টা পেছনের দিকে পোর্টাল ভেইন (Portal vein) এর সাথে লাগানো (Adhesion) ছিল, যেটা ছাড়াতে আমাদের একটু বেগ পেতে হয়েছিল তবে আমরা সফল ভাবেই সেটা করতে সক্ষম হই এবং সফলতার সাথে অপারেশন শেষ করি। অপারেশন এর পর দিন সকালে ওকে দেখি, সবকিছুই ঠিকঠাক ই ছিল। আমাদের প্রটোকল অনুযায়ী আমরা তাকে দুই ঘন্টা পরপর দুই চামচ করে পানি খেতে দেই। সন্ধ্যায় ওর বড় ভাই আমাকে ফোন করে বলে – আকসা র পেট ফোলা মনে হচ্ছে এবং ও বমি করতেছে। আমি তাকে ডিউটি ডক্তার এর সাথে কথা বলতে বলি। এইরকম হতে পারে অপারেশন এর পর কখনো কখনো খাবার টলারেট করতে সময় লাগে। ওর মুখে খাবার বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং নাক দিয়ে পেটে নল দেওয়া হয়। ৩য় দিনে যেয়ে কিছুটা উন্নতি হয়, আমরা ওকে আবার মুখে পানি খেতে দেই। কিন্তু আবার তার পেট ফুলে যায় এবং বমি শুরু হয়। এইবার আমরা একটু সতর্ক হই। ওর পেটের এক্স রে এবং আল্ট্রা সনোগ্রাম করা হয়, ডায়াগনোসিস হয় ইন্টুসাসেপশন (Intussusception)।
ইনটুসাসেপশন মানে হল খাদ্যনালীর একটি অংশ এর পরবর্তী অংশের মধ্যে ঢুকে যাওয়া। সাধারনত ৫-১২ মাস বয়সী বাচ্চাদের এই সমস্যা হয়ে থাকে, যখন বাচ্চারা নতুন খাবার শুরু করে। পেটের ভিতরে যে কোন অপারেশন এর পরে ইনটুসাসেপশনের ঝুকি শতকরা ১ ভাগের ও কম। সেই দুর্ভাগা ১ ভাগের মধ্যেই পড়েছিল আকসা! প্রথম অপারেশন এর ৪র্থ দিন রাতে আবার তার অপারেশন করে ইনটুসাসেপশন ঠিক করি। পিত্তনালীর সাথে খাদ্যনালীর বাইপাস চেক করি, দুই দিকেই সব ঠিক দেখে অপারেশন শেষ করি। ২য় অপারেশনের ২য় দিন থেকে আবার ওর পেট ফুলে যায়, এবার অবস্থা আগের চেয়ে খারাপ। পেটের ভিতরে বাইপাস লিক হওয়ার লক্ষন দেখা যায়। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে পেটের ভিতরে থাকা ড্রেইন টা ব্লক হয়ে যায়। আমরা ওর বাবা -মা র সাথে কথা বলে জরুরি ভিত্তিতে আবার অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাই। এইবার দেখা যায় ওর অপারেশনে যে বাইপাস করা হয়েছিল তার পিত্তনালীর অংশে লিক হয়েছে। আমরা সেটা ঠিক করে অপারেশন শেষ করি। কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যে ৩ টা অপারেশন এর ধাক্কায় ওর ছোট শরীর টা খুব ই দুর্বল হয়ে পরে। তারপর ও তার রিকোভারি ভালোই হচ্ছিল। ৩য় অপারেশন এর ২য় দিন থেকে সে আবার মুখে খাওয়া শুরু করে, এবং খাবার সে ভালোই টলারেট করেছিল। ৪র্থ দিন সকালে আমরা তার শিরায় স্যালাইন দেওয়া বন্ধ করে মুখে স্বাভাবিক নরম খাবার খেতে দেই। ও আস্তে আস্তে উন্নতির পথে ছিল। কিছুদিনের একটা অস্বস্তিকর অবাস্থার সমাপ্তি ধরে নিয়ে সেদিন বাসায় ফিরি।
সন্ধ্যায় হাসপাতাল থেকে ফোন আসে- আকসা র শ্বাস কষ্ট শুরু হয়েছে! আমি কোন কারন খুজে পাই না। প্রটোকল অনুযায়ী ডিউটি ডাক্তার চিকিৎসা শুরু করে , কিন্তু ওর অবাস্থা খারাপ হতে থাকে। রাত ৯ টায় আমি হাসপাতালে যাই। আকসা তখন অজ্ঞ্যান, তীব্র শ্বাস কষ্ট হচ্ছে। সন্ধ্যায় ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা (FFP) দেওয়ার পর থেকে এই সমস্যা শুরু হয়। ট্রান্সফিউশন রিএকশন! তিনটা অপারেশন এর ধাক্কায় ওর রক্তে প্রোটিন এর মাত্রা কমে যাওয়ায় আমরা ৩ দিন FFP দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এবং সেদিন ই ছিল তার শেষ ডোজ! রাত ১২ ট পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকে সম্ভব সব ধরনের চিকিৎসা দেওয়ার পর ওর শ্বাস কষ্ট কিছুটা কমে। ডিউটি ডাক্তার কে সব ধরনের পরামর্শ দিয়ে বাসায় ফিরি।
রাত ৩ টায় হাসপাতাল থেকে আবার ফোন, শ্বাসকষ্ট আবার বেড়েছে। রাত ৩ টা থেকে ভোর ৬ টা ডিউটি তে থাকা ডাক্তার এর সাথে ফোনে চিকিৎসা পরামর্শ দিতে থাকলাম, কিন্তু অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল না। আই সিইউ তে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। শেষ পর্যন্ত ভোরে আমাদের হাসপাতালের আইসিইউ তে সিট না পেয়ে বাইরের একটা প্রাইভেট আইসিইউ তে পাঠানো হল। সেই আইসিইউ তে পরিচিত ডাক্তারদের সাথে ব্যাক্তিগত ভাবে যোগাযোগ করলাম। তাদেরকে সব বিস্তারিত জানালাম। আইসিইউ তে পর্যবেক্ষন চলছিল, হটাত রাতের বেলায় আমার মনে হল নতুন ওই হাসপাতালে ওর অপারেশন এর জায়গা টা কেউ চেক করবে না। একই জায়গায় তিনটা অপারেশন হওয়ায় সেখানে ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। ভোর ৬ টায় চলে গেলাম ওই হাসপাতালে। যা ভেবেছিলাম তাই, ইনফেকশন হয়েছে, ড্রেসিং চেক করা হয়নি। নিজে ড্রেসিং করলাম, প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিলাম। ধীরে ধীরে ওর শ্বাস কষ্ট কমে আসল কিন্ত আকসা কোমায় থাকল। শুধু ড্রেসিং করার সময় ব্যাথা পেলে হাত-পা নাড়ায় এছাড়া আর কোন রেসপন্স নাই!
প্রায় দুই সপ্তাহ ওই প্রাইভেট হাসপাতালে থাকার পর ওদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা চিন্তা করে এবং ওই হাসপাতালে যে সিনিয়র শিশু সার্জন ওনাকে দেখছিলেন উনি দেশের বাইরে যাওয়াতে ওকে আবার শিশু হাসপাতালের আইসিইউ তে নিয়ে আসি।
শিশু হাসপাতালের আইসিইউ তে যখন আসে তখন ওর অপারেশন এর জায়গা দিয়ে অল্প পিত্ত (bile) আসছিল, কিন্তু পেটের ভিতরে পিত্ত জমা হওয়ার কোন লক্ষন (biliary peritonitis) ছিল না। তার কনশাস লেভেল ছিল ৬ (GCS 6)। আমরা অপারেশন এর যায়গায় ভ্যাকুয়াম ড্রেসিং দেই। নিউরোমেডিসিন, ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন সহ সবার পরামর্শ নিই, কিন্তু ওর কোমায় থাকার কারন বা কোমা থেকে উত্তরনের উপাই খুজে পাইনি। আস্তে আস্তে পিত্ত আসা কমে যায়, নাকে নল দিয়ে খাবার দেওয়া শুরু হয়। এক পর্যায়ে ওর আর অক্সিজেন বা স্যালাইন লাগছিল না। ওষুধ ও খাবার নাকের নল দিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। আমরা সিদ্ধান্ত নিই ওকে কেবিনে নিয়ে যাব, মা এর কোলে গেলে হয়তো রেসপন্স করবে। যেদিন কেবিনে দেওয়ার কথা সেদিন সকালে জ্বর আসল, আবার সবকিছু একটু খারাপ হয়ে গেল, কেবিনে নেওয়া গেল না। এভাবে ২/৩ বার কেবিনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হল। এক মাসের বেশি সময় ধরে ও যুদ্ধ টা করে যাচ্ছিল।
সেদিন দুপুরের পর হাসপাতাল থেকে বেড় হওয়ার সময় ভাবলাম আকসা কে দেখে যাই। আইসিইউ তে যেয়ে দেখি ওর অবস্থা হটাত করেই খারাপ হয়ে গেছে। নিউমোনিয়া র লক্ষন দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন আইসিইউ তে থাকলে যা হয়। হাই ফ্লো ন্যাসাল ক্যানুলা দিয়েও রক্তে অক্সিজেন এর মাত্রা ঠিক রাখা যাচ্ছিল না। মন খারাপ করে ওর পরিবারের সবার সামনে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে বাসায় চলে আসি। পরদিন ভোর ৫ টায় আইসিইউ থেকে ফোন আসে, ফোন টা দেখেই বুঝতে পারি কি ঘটেছে। এর কিছুক্ষন পর আকসা র বাবা ফোন করে। কাদতে কাদতে বলেন- স্যার, আমাদের কে একটু তারাতারি ফেরার ব্যাবস্থা করে দেন।
ওর এই অসুস্থতার পুরো সময় টা জুড়ে ওর বাবা-মা, ভাই ও নানা-নানি আমার উপর অগাধ আস্থা রেখেছিল। আমি যাই বলতাম তাই মেনে নিত। ওর বাবা শুধু বলতেন – স্যার, আপনি যেটা ভালো মনে করেন, সেইটাই করেন। আপনি কোন কিছু নিয়ে টেনশন করবেন না। আপনার উপর আমাদের পুর্ন আস্থা আছে।
আমি সেই আস্থার প্রতিদান দিতে পারিনি। আকসা কে ওর বাবা-মা র কাছে ফেরত দিতে পারিনি। এখনো আইসিইউ তে অন্য রোগী দেখতে গেলে আকসা র ওই বিছানা র দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকায়ে থাকি। এরপর ও ওই একই অপারেশন কতগুলো করেছি, সবাই সুস্থ হয়ে ফিরে গেছে, শুধু আকসা চলে গেছে না ফেরার দেশে। সেই দেশে সে ভালো থাকুক, ওর জন্য ভালোবাসা।

