সব মানুষের ই ভুল হয়। হাসপাতালে আমরা বলি- যে যত বেশি কাজ করে তার তত বেশি ভুল হয়, যে কাজ করে না তার ভুল হয় না! একজন বিখ্যাত সার্জন বলেছিলেন- কোন সার্জন যদি বলে যে সে ১০০ অপারেশন করেছে কিন্তু তার কোন জটিলতা হয়নি তাহলে সম্ভাবনা দুইটা, ১। তিনি মিথ্যা বলেছেন, ২। তিনি অপারেশন ই করেন নি!! অন্যান্য পেশার তুলনায় সার্জন দের ভুলের পরিণতি একটু বেশি ই সংবেদনশীল, যেহেতু এটি রোগীর কষ্ট/যন্ত্রনা বাড়াতে পারে এমনকি জীবন সংশয় হতে পারে। একজন সার্জন যখন ভুল করে তখন তার ভুলের প্রথম শিকার তার রোগী, ভুলের মাত্রার উপর নির্ভর করে সে কতটা ক্ষতির স্বীকার হবে। কিন্তু এই ভুলের আরো একজন শিকার বা ক্ষতিগ্রস্ত আছেন। সেটা সার্জন নিজে। যে কোন দুর্ঘটনার পর সার্জন একটা মানসিক হতাশা, লজ্জা বা অপরাধবোধ এ ভোগেন, কেউ কেউ সেই যন্ত্রনা সহ্য করতে না পেরে পেশা বদল করেছেন এমন নজির ও আছে। এইজন্যই সার্জন দের কে বলা হয় এই দুর্ঘটনার দ্বিতীয় শিকার বা second victim.
এই second victim রা কোন দুর্ঘটনার পর কি ভাবে রেসপন্ড করে তার উপর নির্ভর করে তার পরবর্তী রোগীর সেবা কেমন হবে। সে যদি বিষন্ন বা ভয়ে থাকে তাহলে সেটা তার রোগীর সেবায় মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। সারা বিশ্বেই তাই সার্জন দের মধ্যে এই second victim এর যত্ন নিয়ে কথা হচ্ছে।
সম্প্রতি আমেরিকার একটি হাসপাতাল তাদের সার্জন দের মধ্যে এক জরিপের ফলাফল প্রকাশ করেছে (https://www.jpedsurg.org/article/S0022-3468(22)00445-6/fulltext?dgcid=raven_jbs_etoc_email)। সেখানে দেখা যায় সার্জন দের মধ্যে second victim এর সংখ্যা অনেক বেশি। তাদের প্রায় ৮২% সার্জন এই সমস্যায় পরেছেন। ৫৬% সার্জন মনে করেন ভুল এর ঘটনা অন্যদের জানানো হলে তাদের ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জুনিয়র সার্জন রা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের মানসিক কষ্ট টা চেপে রাখেন এবং সিনিয়র দের কাছে জানাতে চান না।
একটা টেক্সট বই এ পড়েছিলাম – It is normal to have some sleepless nights after intestinal anastomosis during training period. একজন ট্রেইনি সার্জন যখন খাদ্যনালী জোড়া দেয় তখন দুশ্চিন্তায় কয়েক রাত ঘুম না হওয়া স্বাভাবিক। আমি নিজেও এই দুঃসহ সময় পার করেছি। প্রতিদিন ই অপারেশন করে বাসায় এসে চিন্তা করতাম – অপারেশন টা ঠিকঠাক হইছে তো! ঘুমানোর সময় চোখের সামনে শুধু অপারেশন দেখতাম, মনে হতো – ওই কাজ টা ওই ভাবে করলে মনে হয় ভালো হতো!! আমার স্ত্রী বিরক্ত হয়ে বলতো – তুমি সার্জারি বাদ দিয়ে মেডিসিন পড়!!!
দুশ্চিন্তা আমার এখনো হয়, তবে এখন যেহেতু দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়ছে এবং নিজের অবস্থানের ও পরিবর্তন হইছে তাই দুশ্চিন্তার ধরন ও বদলাইছে। একটা কথা প্রচলিত আছে – জুনিয়র সার্জনের হাতে যদি রোগী খারাপ হয় তাহলে সার্জনের দোষ, আর সিনিয়র সার্জনের হাতে রোগি খারাপ হলে রোগী টার ই সমস্যা ছিল!!!
যায়হোক, সার্জন কে second victim এর পরিস্থিতি থেকে উন্নতির দুইটা উপায় আছে- ১। দায়িত্ব নেওয়া – যে সমস্যা টা হয়েছে সেটাকে দায়িত্ব নিয়ে ঠিক করার চেষ্টা করা, প্রয়োজনে অন্য কারো সাহায্য নেওয়া। ২। নিজের খারাপ অনুভুতি গুলো মনের মাঝে আটকে না রেখে সহকর্মী দের সাথে শেয়ার করা। এক্ষত্রে সহকর্মী দের ও সেই সার্জন এর প্রতি দায়িত্বশীল আচরন করতে হবে।
শেষ কথা, প্রথম ভিকটিম যতো কম হবে, দ্বিতীয় ভিকটিম ও ততো কম হবে। তাই সার্জারির ক্ষেত্রে যথাযথ সেইফটি প্রটোকল মেনে চলা উচিত।
