বাংলাদেশের কালজয়ী কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ এর একটা বই পড়েছিলাম – তেতুল বনে জ্যোৎস্না। তখন আমি ইন্টারমিডিয়েট এ পড়ি, ২০০২ সাল। বই টা পড়ার পর আমার মনে হয়েছিল ডাক্তার হতে না পারলে এই জীবন ব্যর্থ! গল্পের মূল চরিত্রে ছিলেন একজন ডাক্তার, যার পোস্টিং ছিল গ্রামে। সেই গ্রামের মানুষের সাথে তার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি সাইকেল নিয়ে রোগী দেখতে যেতেন। তার সম্পর্কে গ্রামে খুব সুন্দর সুন্দর কথা প্রচলিত ছিল। যেমন- কোন মৃত্যু পথযাত্রী রোগী যদি ডাক্তার এর সাইকেল এর টুংটাং শব্দ শুনে তাহলে সে সাথে সাথেই সুস্থ হয়ে যাবে এবং বিছানা ছেড়ে উঠে বলবে ‘ মুরগির সালুন দিয়া ভাত খাব’।
ডাক্তার এর বউ থাকতেন ঢাকায়, গ্রামে থাকা তার পছন্দ ছিল না। কিন্তু একবার গ্রামে বেড়াতে এসে গ্রামের মানুষের সাথে ডাক্তার এর সম্পর্ক দেখে তার খুব ভালো লাগে। যাওয়ার সময় ট্রেইনের দরজায় দাঁড়িয়ে সে দেখল ডাক্তার এর চোখ থেকে পানি পড়ছে। ঢাকায় ফিরে সে ডাক্তার কে চিঠি লিখল – ডাক্তার সাহেব, তুমি আমার জন্য দু ফোটা চোখের জল ফেলেছ, আমি তোমার জন্য জনম জনম কাদিব।
পুর্নিমার রাতে শ্বষান ঘাটে বসে সেই চিঠি পড়ে ডাক্তার সাহেব কাদছিলেন। সেটা দেখে গ্রামের পাগল মতি মিয়া বলেছিল – ডাক্তার টার মাথায় সমস্যা আছে!!
হুমায়ুন আহমেদ এর গল্পের কারণেই হয়তো গল্পের সেই সাইকেল ডাক্তার আমার মনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে ছিল।
কিন্তু, গল্প আর বাস্তব এক নয়! বাস্তবের বড় ডাক্তার রা সাইকেল নিয়ে রোগী দেখতে যান না, রোগী রাও সাইকেল এর শব্দে সুস্থ হয়ে যান না। বাস্তবের বড় ডাক্তার রা থাকেন গম্ভীর আর তাদের থাকে বড় বড় গাড়ি।
যাইহোক, সেই সাইকেল ডাক্তার এর মত গ্রামে চাকরি না করলেও আমার এখন একটা সাইকেল আছে এবং এটি নিয়ে আমি আমার চেম্বারে যাই। তবে আমার সাইকেল এর টুংটাং শব্দ রোগী র কান পর্যন্ত যায় না। ঢাকার শব্দ দূষণ অনেক বেশি তো, তাই।
রোগী রাও তাই আর সাইকেল এর শব্দে সুস্থ হয়ে যান না!
বাসা থেকে আমার চেম্বার খুব কাছে (এক কিলোমিটার এর কম)। ছোট এই রাস্তাটা সাইকেল এ যেতে আমার ভালোই লাগে। শরীর ও সাইকেল দুইটাই সচল থাকে। প্রতিদিন কিছু রিকশা ভাড়া ও বেচে যায়! এছাড়াও ধানমণ্ডি ও মোহাম্মদপুর এলাকায় কিছু হাসপাতালে মাঝে মাঝে রোগী দেখতে যেতে হয়, সেখানেও সাইকেল নিয়ে যাই।
তবে এর কিছু নেগেটিভ দিক ও আছে। প্রথম সমস্যা টা হচ্ছে সাইকেল রাখা। সব জায়গায় বড় গাড়ি পার্ক করার ব্যবস্থা থাকলেও সাইকেল পার্কিং এর ব্যবস্থা থাকে না।
দ্বিতীয় সমস্যা টা হচ্ছে রোগী র স্বজনরা ডাক্তার এর উপর আস্থা পায় না! তারা যখন দেখে ডাক্তার সাইকেলে যাতায়াত করে তখন তারা আস্থার সংকটে ভোগে। ভাব টা এমন – যেই ডাক্তার এর গাড়ি নাই, সাইকেল এ চলাচল করে সে নিশ্চয় ভালো ডাক্তার না! (এই ধারণা অমূলক না🤔🤭)
আমার মনে আছে একবার শিশু হাসপাতালে এক মা তার বাচ্চাকে নিয়ে আসছিলেন পা এর সমস্যার জন্য। আমি তখন সপ্তাহে একদিন পা বাকা (ক্লাব ফুট) বাচ্চাদের প্লাস্টার করতাম। অপারেশন থিয়েটারের বেডে রোগী দেখে সেখানেই প্লাস্টার করতাম, সেখানে আলাদা করে রোগী দেখার জন্য কোন চেয়ার-টেবিল ছিল না। ভদ্রমহিলা জিজ্ঞেস করলেন – স্যার, আপনি এইভাবে দাড়ায়ে দাড়ায়ে রোগী দেখেন?
-জ্বি, এইখানে তো বসার কোন ব্যবস্থা নাই!
বিশ্বাস করেন বা না করেন, উনি উনার বাচ্চার চিকিৎসা আমাকে দিয়ে করান নি। যেই ডাক্তার এর বসার ব্যবস্থা হাসপাতাল করেনি, সে নিশ্চয় ভালো ডাক্তার না 🤭। এখন হাসপাতাল আমাকে যেই রুম টা দিছে সেইটাকে তাই আমি যথাসম্ভব গুছায়ে রাখার চেষ্টা করি। প্রথম দর্শন টা যেন ঠিক ঠাক হয়, গুনের বিচার পরে !
জার্মান যাওয়ার পরপরই আমি একটা সাইকেল কিনেছিলাম। তখন আমার এক জার্মান কলিগ বলছিল – ‘Jetzt hast du einen Teil der deutschen Kultur’. এর মানে হল – তোমার কাছে এখন জার্মান কালচার এর একটা অংশ আছে। সাইকেল আসলেই জার্মান কালচার এর একটা অংশ। সেখানে বাচ্চারা হাটা শেখার আগে সাইকেল চালানো শিখে৷ তবে জার্মানিতে আমার সাইক্লিং এর অভিজ্ঞতা সুখকর না। সাইকেল কেনার এক সপ্তাহের মধ্যেই একদিন সন্ধ্যার পর খালি রাস্তায় (কোভিড এর জন্য লকডাউন চলছিল) কানে হেডফোন লাগায়ে মনের সুখে সাইকেল চালাচ্ছিলাম। ফাঁকা রাস্তা পেয়ে দুইটা সিগ্নাল না থেমে চলে আসছি। হটাত শুনি পেছনে প্যাঁ পু আওয়াজ! তাকিয়ে দেখি টহল পুলিশ! সুন্দরী একজন মহিলা পুলিশ গাড়ি থেকে মুখ বেড় করে বলে –
Was machst du denn da? Hast du die rote Ampel nicht gesehen?
Weißt du nicht, dass Kopfhörer beim Fahrradfahren nicht erlaubt sind?
এর মানে হইল, তুমি এইটা কি করতেছ? তুমি কি লাল বাত্তি দেখনাই?
তুমি কি জাননা যে সাইকেল চালানোর সময় হেডফোন ব্যাবহার করা নিষেধ?
আমি মুখ কাচুমাচু করে বললাম – Entschuldigung (Sorry!)। সেই যাত্রায় শুধু সরি বলেই মাফ পেয়ে গেছিলাম। কিন্তু পরের সপ্তাহেই মোটামুটি বড় দুর্ঘটনার শিকার হই। জার্মানিতে রাস্তার উপর ট্রাম লাইন আছে। একদিন হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে আমার চলন্ত সাইকেলের চাকা ট্রাম লাইনে ঢুকে যায় এবং আমি সাথে সাথে সাইকেল থেকে ছিটকে পড়ি। আমার বাম হাতে ফ্র্যাকচার হয়েছিল। হাসপাতালে যাওয়ার পর জানতে পারছিলাম এইটা জার্মানিতে কমন একটা দুর্ঘটনা! ছয় সপ্তাহ প্লাস্টার রাখতে হইছে। ওই সময়টাই ওটি তে যেতে পারিনাই। যেহেতু আমি একা থাকতাম, দৈনন্দিন কাজ করতেও ওই সময় আমার খুব কষ্ট হইছে। যাইহোক, কষ্টের সময় একদিন ঠিকই শেষ হয়ে গেছে, এবং জার্মানি তে রোগী হিসেবেও একটা অভিজ্ঞতা হইছে। সেই গল্প আরেকদিন বলা যাবে।
এই ঘটনার সাথে আরেকটা ঘটনা বলি। কিছুদিন আগে ঢাকায় একটা গ্রুপের সাথে ছুটির দিন সকালে সাইক্লিং করতে বের হইছিলাম। আমার বন্ধু লালন আমাকে ওই গ্রুপ এর সাথে পরিচয় করায়ে দিছিল। সবাই খুব এলিগেন্ট সাইক্লিস্ট। মানুষ হিসেবেও তারা খুব ভালো। তো আমরা হাতিরঝিল থেকে শুরু করে গুলশান বনানী হয়ে উত্তরার দিকে যাচ্ছিলাম। রেডিসনের কাছে যখন রেল ক্রসিং পড়ল সাথে সাথে আমার জার্মানি র কথা মনে পড়ল। আমার পাশে যিনি ছিলেন তাকে তখন আমি জার্মানির ঘটনা টা বললাম। ঠিক এক মিনিট পড়েই ভদ্রলোক একই রকম একটা দুর্ঘটনায় পড়লেন। উনার ছিল রোড বাইক, চাকা টা চিকন। রাস্তার পিচ মেশিন দিয়ে কাটা ছিল। চলন্ত সাইকেলের চাকা সেই কাটাতে লাগতেই উনি নিয়ন্ত্রন হাড়িয়ে ফেলেন এবং সাইকেল সহ পড়ে যান। উনি অনেক ব্যাথা পেয়েছিলেন মাথায় এবং মুখে। কিছুক্ষন উনার ব্র্যাডিকার্ডিয়া (হার্ট রেট কম) হচ্ছিল, আমি একটু ভয় পেয়ে গেছিলাম। তবে উনি ঠিক হয়ে গেছিলেন, সেদিন আর সাইক্লিং করেননি, বাসায় ফেরত যান। আমার খুব অপরাধবোধ কাজ করছিল। মনে হচ্ছিল আমি এই দুর্ঘটনার কথা বলাতেই উনি এই দুর্ঘটনায় পড়লেন। তবু ভালো যে কোন সমস্যা ছাড়াই উনি সেরে উঠেছেন।
আসলে ঘটনা দুর্ঘটনা সবই জীবনের অংশ। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের দেশের বাবা মা রা এখন অতি সচেতন। বাচ্চা ব্যাথা পাবে বলে অনেক বাবা মা ই বাচ্চাদের সাইকেল চালাতে এমন কি খেলাধুলা করতে দেন না। এটা ঠিক না। এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বাচ্চাদের উপর পরে।
আমাদের দেশে সাইক্লিং কে আরো উৎসাহিত করা প্রয়োজন। এটি একমাত্র পরিবেশ বান্ধব ও স্বাস্থ্যকর পরিবহন ব্যবস্থা! আশা করি অচিরেই সরকারি পর্যায় থেকে সাইক্লিং কে উৎসাহিত করা হবে এবং ঢাকায় সব রাস্তায় আলাদা সাইকেল লেন থাকবে। তাহলে সাইক্লিং হবে আরো নিরাপদ। এখন হাতে গোনা কয়েকটা জায়গায় সাইকেল লেন আছে, যেমন মানিক মিয়া এভিনিউ তে। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ এর সাথে পরিচিত না, যার ফলে এর ব্যবহার হয় না।
সাইক্লিং হোক কাজের জন্য, সাইক্লিং হোক আনন্দের জন্য, সাইক্লিং হোক সুস্বাস্থ্যের জন্য…

