বাচ্চা যখন মা এর পেটে থাকে, বাবা- মা তখন অনেক আবেগ ও স্বপ্ন নিয়ে অপেক্ষা করেন। ছেলে হলে কি নাম হবে, মেয়ে হলে কি নাম রাখবেন তা ঠিক করেন। কিন্তু কখনো কখনো তাদের এই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে পারে, যখন তারা বাচ্চা জন্মের পর বুঝতে পারেন না বাচ্চা ছেলে না মেয়ে।
আমরা কিভাবে বুঝতে পারি একটি বাচ্চা ছেলে না মেয়ে?
- জেনিটালিয়া বা জননাঙ্গ দেখে।
ছেলে বাচ্চা হলে তার একটা পেনিস (পুরুষাঙ্গ) থাকবে, যার মাথায় পস্রাবের রাস্থা থাকবে। একটা অন্ডথলি (Scrotum) থাকবে , যেখানে দুইটা টেস্টিস থাকবে। মেয়ে বাচ্চা হলে তার ছোট একটা ক্লাইটোরিস থাকবে (যেটা অনেক সময় বাইরে থেকে বোঝা যায়না) ল্যাবিয়া ম্যাজরা ও মাইনরা থাকবে আর এর ভিতরে পস্রাবের রাস্তা (Urethra) ও মাসিকের রাস্তা (Vagina) থাকবে।
কিন্তু কিছু কিছু বাচ্চার ক্ষেত্রে দেখা যায়- বাচ্চার জননাঙ্গ ছেলেদের পেনিস হওয়ার মতো যথেষ্ঠ বড় না আবার মেয়েদের ক্লাইটোরিস হওয়ার মতো যথেষ্ঠ ছোট না। অন্ডথলি টা ছেলেদের মতো সুগঠিত না আবার মেয়েদের মতো দুই অংশে বিভক্তও না। পস্রাবের রাস্তা ছেলেদের মত জননাঙ্গের মাথায় না আবার মেয়েদের মতো মাসিকের রাস্তা থেকে আলাদাও না! মেডিকেলের ভাষায় এই অবস্থা কে বলা হয় DSD-Disorder of sexual differentiation (যৌন পার্থক্যের সমস্যা)। সাধারন ভাষায় একে বলা হয় হিজরা।
কি কারনে এই সমস্যা হয়?
কারনগুলোকে সাধারনত দুই ভাগে ভাগ করা যায়-
১। হরমোনাল (বায়োকেমিক্যাল)
২। ক্রোমোজোমাল (জিনগত)
সমাধান কি?
সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত ও সেই অনুযায়ী চিকিৎসা এই বাচ্চাগুলোকে একটা স্বাভাবিক জীবন দিতে পারে। চিকিৎসার ধাপগুলো নিম্নরুপ-
১। প্রাথমিক চিকিৎসা – সধারনত হরমোনাল কারনে DSD হলে বাচ্চার জরুরি প্রাতমিক চিকিৎসা লাগতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সারাজীবন ওষুধ খেতে হতে পারে।
২। লিঙ্গ নির্ধারনঃ এক্ষেত্রে দুইটা বিষয় মাথায় রাখতে হয়- বাচ্চার জিনগত গঠন (ছেলে /মেয়ে) ও তার লিংগের গঠন (ছেলে হওয়া সহজ না কি মেয়ে হওয়া সহজ)। সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সে কি হিসাবে বড় হবে। তবে এ ক্ষেত্রে সবসময় লক্ষ্য থাকে যেন ভবিষ্যতে সে বাবা বা মা হতে পারে (Productive human being)। অনেক দেশেই এই সিদ্ধান্তের জন্য বাচ্চা বড় হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়- সে ছেলে হতে চায় নাকি মেয়ে! আমাদের দেশে এখনো বাবা-মা ই বাচ্চার পক্ষে সিদ্ধান্ত নেন।
৩। জেনিটোপ্লাস্টিঃ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেখতে গ্রনযোগ্য ও কার্যক্ষম লিঙ্গ তৈরি করা।
গত তিন মাসে আমরা দুটি বাচ্চা কে মেয়েতে রুপান্তর করেছি। একটি বাচ্চা কে ছেলে তে রুপান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। দুই ধাপ এর অপারেশন শেষ হয়েছে, আরো দুই ধাপ বাকি।
যে দুটি বাচ্চা কে মেয়ে তে রুপান্তর করা হয়েছে তাদের মধ্যে ছোট মেয়েটির বয়স ছিল ২ বছর। ওর শুধু ক্লাইটোরিস টা অস্বাভাবিক বড় ছিল, দেখতে ছিল অনেকটা ছেলে দের মত। ক্রোমোজম ও হরমোনাল ফাংশান স্বাভাবিক ছিল। আমরা Reduction clitoroplasty করেছে। এখন সে দেখতে স্বাভাবিক মেয়েদের মত।

অপারেশন এর ভিডিও লিংক- https://www.youtube.com/watch?v=8-mJL58so3E
দ্বিতীয় মেয়েটির বয়স ১০ বছর। তার হরমোনাল সমস্যা আছে। মেডিকেল এর ভাষায় এটি Congenital adrenal hyperplasia (CAH). জন্মের পর থেকেই সে শিশু হরমোন বিশেষজ্ঞের তত্বাবধানে আছে। তার ক্লাইটোরিস অস্বাভাবিক বড়, ল্যাবিয়া মাইনরা ছিলনা, পস্রাব ও মাসিকের রাস্তা মিলে একটি ছিদ্র ছিল। আমরা তার Feminizing genitoplasty করেছি। এখানে আমরা ক্লাইটোরিস টা ছোট করেছি, ল্যাবিয়া মাইনরা তৈরি করেছি এবং মাসিকের রাস্তা ও পস্রাবের রাস্তা আলাদা করেছি।

দুইটি বাচ্চার ই জননাঙ্গ এখন দেখতে মেয়েদের মত। আমরা আশাবাদী, তারা কার্যক্ষম হবে। তবে এরা বড় হলে অনেকসময় মানসিক হীনমন্যতায় ভুগতে পারে। সেইদিকে সতর্ক থাকতা হবে এবং পারিবারিক ও সামাজিক সহযোগীতা নিশ্চিত করতে হবে।

