শিশুদের কুঁচকির হার্নিয়া বা ইনগুইনাল হার্নিয়া একটি খুব সাধারণ সার্জিক্যাল সমস্যা। ছেলে ও মেয়ে—দুই ধরনের শিশুরই এই সমস্যা হতে পারে। বাইরে থেকে দেখতে সমস্যাটি অনেক সময় একই রকম মনে হলেও অপারেশনের সময় ছেলে ও মেয়ে শিশুর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পার্থক্য থাকে। এই পার্থক্যগুলো জানা অভিভাবকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সঠিক সময়ে সঠিক সার্জারি শিশুর ভবিষ্যৎ সুস্থতার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
ইনগুইনাল হার্নিয়া কী?
ইনগুইনাল হার্নিয়া হলো কুঁচকির একটি জন্মগত দুর্বলতা বা খোলা পথ দিয়ে পেটের ভেতরের অংশ বাইরে চলে আসা। সাধারণত শিশুর কান্না, কাশি বা চাপ দেওয়ার সময় কুঁচকিতে ফোলা দেখা যায়। অনেক সময় ঘুমালে বা শুয়ে থাকলে ফোলাটি কমে যায়।
ছেলেদের ক্ষেত্রে ফোলাটি অণ্ডথলি পর্যন্ত নেমে আসতে পারে। মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রেও কুঁচকিতে ফোলা দেখা যায়, এবং অনেক সময় হার্নিয়ার থলির মধ্যে ডিম্বাশয় আটকে থাকতে পারে।
কেন এই হার্নিয়া নিজে নিজে ভালো হয় না?
শিশুদের ইনগুইনাল হার্নিয়া সাধারণত জন্মগতভাবে একটি পথ খোলা থাকার কারণে হয়। এই খোলা পথ নিজে নিজে বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপারেশনই এর নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা।
হার্নিয়া রেখে দিলে যেকোনো সময় তা আটকে যেতে পারে। তখন শিশুর ব্যথা, বমি, অস্থিরতা, ফোলা শক্ত হয়ে যাওয়া বা পেট ফোলা দেখা দিতে পারে। এমন অবস্থায় জরুরি অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে।
অপারেশনের মূল উদ্দেশ্য
ইনগুইনাল হার্নিয়া অপারেশনের মূল উদ্দেশ্য হলো হার্নিয়ার খোলা পথ বন্ধ করা এবং ভবিষ্যতে হার্নিয়া আটকে যাওয়া বা পুনরায় হওয়ার ঝুঁকি কমানো। তবে এই অপারেশনের সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নিরাপদে রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখানেই ছেলে ও মেয়ে শিশুর অপারেশনের গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।
ছেলে শিশুদের হার্নিয়া অপারেশনে কী বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
ছেলে শিশুদের ক্ষেত্রে হার্নিয়ার থলির খুব কাছ দিয়ে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গঠন যায়— শুক্রবাহী নালী এবং অণ্ডকোষের রক্তনালী।
অপারেশনের সময় হার্নিয়ার থলিকে এই সূক্ষ্ম গঠনগুলো থেকে খুব যত্নসহকারে আলাদা করতে হয়। শিশুর বয়স যত কম, এই গঠনগুলো ততই ছোট, নরম ও সংবেদনশীল থাকে। তাই অপারেশনের সময় অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন।
শুক্রবাহী নালীতে আঘাত লাগলে ভবিষ্যতে প্রজনন ক্ষমতার উপর প্রভাব পড়তে পারে। আবার অণ্ডকোষের রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হলে অণ্ডকোষের রক্ত সরবরাহ কমে যেতে পারে। যদিও অভিজ্ঞ হাতে এই জটিলতা খুবই বিরল, তবুও এটি অপারেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সহজভাবে বলা যায়— ছেলে শিশুদের হার্নিয়া অপারেশনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শুক্রবাহী নালী ও অণ্ডকোষের রক্তনালী নিরাপদ রাখা।
মেয়ে শিশুদের হার্নিয়া অপারেশনে কী বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে হার্নিয়ার থলির মধ্যে অনেক সময় ডিম্বাশয় অথবা ফ্যালোপিয়ান টিউব থাকতে পারে। বিশেষ করে ছোট বয়সী মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি বেশি দেখা যায়।
যদি ডিম্বাশয় হার্নিয়ার মধ্যে আটকে যায়, তাহলে তার রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। এতে ডিম্বাশয় ঘুরে যাওয়া, ফুলে যাওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই মেয়ে শিশুর হার্নিয়া হলে সেটি অবহেলা করা উচিত নয়।
অপারেশনের সময় সার্জনের প্রথম কাজ হলো ডিম্বাশয় বা টিউব আছে কি না তা ভালোভাবে দেখা, থাকলে সেটিকে নিরাপদে পেটের ভেতরে ফিরিয়ে দেওয়া এবং এরপর হার্নিয়ার পথ বন্ধ করা।
সহজভাবে বলা যায়—
মেয়ে শিশুদের হার্নিয়া অপারেশনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ডিম্বাশয় ও ফ্যালোপিয়ান টিউব নিরাপদ রাখা।
কখন দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন?
নিচের লক্ষণ থাকলে দেরি না করে দ্রুত শিশু সার্জনের পরামর্শ নিতে হবে কুঁচকির ফোলা শক্ত হয়ে গেলে,ফোলাটি চাপ দিলেও ভেতরে না গেলে, শিশু বেশি কান্নাকাটি করলে, বমি হলে,পেট ফুলে গেলে, ফোলার জায়গায় ব্যথা বা লালচে ভাব থাকলে, মেয়ে শিশুর কুঁচকিতে স্থায়ী ফোলা থাকলে।
এগুলো হার্নিয়া আটকে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে।
সময়মতো অপারেশন কেন জরুরি?
পরিকল্পিতভাবে সময়মতো অপারেশন করলে ঝুঁকি অনেক কম থাকে। শিশু সাধারণত দ্রুত সুস্থ হয়ে যায় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একই দিন বা পরদিন বাসায় যেতে পারে।
অন্যদিকে হার্নিয়া আটকে গেলে জরুরি অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে, যা তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
তাই শিশুর কুঁচকিতে ফোলা দেখা গেলে অপেক্ষা না করে শিশু সার্জনের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শেষ কথা
ছেলে ও মেয়ে শিশুদের ইনগুইনাল হার্নিয়া দেখতে একই রকম মনে হলেও অপারেশনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভিন্ন।
ছেলে শিশুদের ক্ষেত্রে শুক্রবাহী নালী ও অণ্ডকোষের রক্তনালী রক্ষা করা জরুরি।
মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে ডিম্বাশয় ও ফ্যালোপিয়ান টিউব রক্ষা করা জরুরি।
সঠিক সময়ে অভিজ্ঞ শিশু সার্জনের মাধ্যমে অপারেশন করালে অধিকাংশ শিশুই নিরাপদে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারে।
শিশুর কুঁচকিতে ফোলা দেখলে অবহেলা নয়—সময়মতো সঠিক চিকিৎসাই শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যতের চাবিকাঠি।
ডা: মো: সামিউল হাসান
সহযোগী অধ্যাপক (শিশু সার্জারি)
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইন্সটিটিউট
নবজাতক ও শিশু সার্জারি এবং শিশু ইউরোলোজি বিশেষজ্ঞ
www.drsamiulhasan.com

